বাংলাদেশে কওমী মাদরাসা শিক্ষার সর্ববৃহত বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফের সাথে বিভিন্ন সময়ে কওমী মাদরাসার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের সাথের বেশকিছু ফোনালাপ প্রকাশ পেয়েছে ফেসবুকে। যা নিয়ে উত্তাল হয়ে আছে ফেসবুকের কওমী অঙ্গন। এমনকি সার্বিক এই বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আজ ১৪ জুলাই বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার কেন্দ্রীয় কার্যালয় এক জরুরি বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে।
[বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফ]
- যে সব কল রেকর্ডে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফের সাথে বেফাক মহাসচিব আল্লামা আবদুল কুদ্দুস থেকে নিয়ে আল্লামা শফিপূত্র আনাস মাদানী এবং হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবদুল গনী ও বেফাকের সিনিয়র পরিদর্শক মুফতী মোহাম্মদ ত্বহার সাথে বিভিন্ন স্পর্শকাঁতর বিষয়ে বলা বিভিন্ন কথা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এসব ফোনালাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্যাটার্ন হলো – সব ফোনালাপই বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফের সাথে বলা বিভিন্নজনের কথা। যে বিষয়ে বেফাকের উধ্বর্তন মহলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি পাবলিক ভয়েসকে বলেছেন – ‘এসব ফোনালাপ সবই যেহেতু মাওলানা আবু ইউসুফের তাই ধরে নেওয়া যায় তাঁর ফোন থেকেই ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে’। এবং ফোনালাপ বিষয়ে তদন্তপূর্বক বেফাক যথাযোগ্য পদক্ষেপও নিবে।
কওমী মাদরাসা বিষয়ক পাবলিক ভয়েসের সকল নিউজ প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন
এসব ফোনালাপের মধ্যে বেফাক মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস এর সাথে রয়েছে একাধিক বিষয়ে কথাবার্তা। তবে ফোনালাপের বিভিন্ন অংশ খন্ডিত বলে পাবলিক ভয়েসের কাছে দাবি করেছেন মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সংশ্লিষ্ট একটি মহল।
অপরদিকে মাওলানা ইউসুফের সাথে আল্লামা আবদুল কুদ্দুসের সাথে ফাঁস হওয়া কয়েকটি ফোনালাপের মধ্যে একটি রয়েছে হাইআতুল উলয়ার অধিনে মাস্টার্সের মান পাওয়া দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ফজিলত বিভাগের (মেশকাত) মার্কশিট জমা দেওয়া প্রসঙ্গে।
[বেফাক মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস]
এই মার্কশীট প্রসঙ্গে পাবলিক ভয়েসের সাথে কথা হয়েছে বেফাক ও হাইয়া সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূত্রের সাথে। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কিছু স্পর্শকাঁতর বিষয় স্বীকার করেছেন পাবলিক ভয়েসের কাছে। যা পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হচ্ছে –
শুধু বেফাক নয় মার্কশিট ইস্যুতে জড়িত কয়েকটি বোর্ড ও শতাধিক মাদরাসা :
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক হাইআতুল উলয়ার অধিনে কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মার্স্টার্সের মান দেওয়ার পর প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো ২০১৯ সালের ০৮ এপ্রিল তারিখে। পরবর্তিতে প্রশ্ন ফাঁসের বিতর্কের কারণে প্রথম তারিখ বাদ দিয়ে ২৩ এপ্রিল থেকে ৩মে পর্যন্ত দাওরায়ে হাদিস তথা তাকমিল জামাতের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের মান পাবেন বলেও সিদ্ধান্ত হয়।
এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আল হাইয়াতুল উলিয়ার শর্ত ছিল – বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত কওমি মাদ্রাসার সর্বমোট ৬ টি বোর্ডের যেকোনো একটি বোর্ড থেকে ফজিলত (মেশকাত) জামাতের পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া। কেউ যদি ফজিলত জামাতে এই বোর্ডগুলো থেকে পরীক্ষা না দিয়ে থাকে তবে তাদেরকে হাইআতুল উলিয়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তীতে হাইআতুল উলইয়ার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য সারাদেশের প্রায় দুই শতাধিক মাদ্রাসা ফজিলত জামাতের মার্কশিট নিজেরা বানিয়ে হাইআতুল উলয়া এবং বেফাকে জমা দিয়েছে বলে পাবলিক ভয়েসকে জানিয়েছেন বেফাকের একটি বিশ্বস্থ সূত্র। এবং সে সবের ডকুমেন্ট তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং পাবলিক ভয়েসের প্রতিবেদকও তা দেখেছেন।
এ বিষয়ে তিনি পাবলিক ভয়েসকে আরও বলেন – কেবলমাত্র বেফাক বোর্ডই নয় বরং এই মার্কশিট জালিয়াতিতে অংশ নিয়েছে দেশের প্রায় শতাধিক মাদরাসা। এর রুপরেখা সম্পর্কে তিনি বলেন – মূলত ওইসব মাদরাসাগুলোতে ফজিলত জামাতে উত্তীর্ণ হওয়া ছাত্র ছিল না বা থাকলেও দু-চারজন ছিল কিন্তু হাইআতুল উলিয়ার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তারা নিজেরা মার্কশিট বানিয়ে এবং কেউ কেউ বোর্ডের মার্কশিট বিষয়ক রেজিস্টার চেঞ্জ করে তারপরে মার্কশিট জমা দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করে বলেন, যে ভয়েস রেকর্ড শুনেছেন সেখানে কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি বড় মাদরাসাসহ আরও বেশকিছু মাদরাসার নাম এসেছে। যারা এসব মার্কশিট পরিবর্তনের কাজ করেছে।
আলাপকালে তিনি প্রসঙ্গ টেনে বলেন – এ বিষয়টিতে কেবল কোন মাদরাসা নয় বরং একটি বোর্ডও স্বতন্ত্রভাবে জড়িত ছিলো যারা তাদের মার্কশীট বিষয়ক রেজিস্টার পরিবর্তন করে জমা দিয়েছেন। এবং পরিবর্তিত সেই রেজিস্টারের বিষয়ে অনেকেই জানতো।
অপরদিকে এভাবে মার্কশিট জমা দেওয়া দুইশ প্রায় মাদরাসার মধ্যে পরবর্তিতে ১২০ টি মাদরাসার প্রায় ৭শ থেকে ৮শ ছাত্র-ছাত্রীর মার্কশিট বিভিন্নজনের অনুরোধে বোর্ডগুলো গ্রহণ গ্রহণ করেছে এবং সেগুলো হাইআতুল উলিয়ার কাছে জমা দিয়েছে। যে মার্কশিট এর অধীনেই সেইসব ছাত্রছাত্রীরা তাকমীল তথা দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে।
তিনি প্রসঙ্গ টেনে বলেন – সবকিছুই যে দুর্নীতি ছিলো বিষয়টি তা নয় বরং এখানে কিছু সমন্বয়হীনতাও ছিল যা বেফাক এবং হাইআাতুল উলিয়ার লোকবল, জনবল এবং কর্ম দক্ষতার অভাবেও হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে যথাযোগ্য তদন্ত এবং সুরাহামূলক ফয়সালা আসা উচিত বলেও তিনি মনে করেন। একই সাথে এসব বিষয়ে জনসম্মুখে কথা হলে সবারই ইজ্জত নষ্ট হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বিশেষ করে তিনি দু একটি মহলকে ইঙ্গিত করে বলেছেন যে – অনেকেই বিষয়টাতে উসকানি দিচ্ছে যাদের অনেক বিষয়ও বেফাক ও হাইআতুল উলয়ার বর্তমান অনেকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
কল রেকর্ড ফাঁস হলো কিভাবে এবং এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে :
বেফাকের এই বিশ্বস্থ সূত্রটির সাথে প্রতিবেদকের কথা বলার সময়ে প্রসঙ্গক্রমে এসেছিলো যে – বেফাকের এসব স্পর্শকাঁতর বিষয়গুলোর কল রেকর্ডিং কিভাবে ফাঁস হতে পারলো? তাছাড়া বেশ কিছু ভেতরগত তথ্যও বা কিভাবে সামনে এলো।
এ বিষয়ে তিনি বলেন –
এর বিভিন্ন দিক রয়েছে। বেফাক কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এই ফোনালাপ ফাঁস এবং অন্যান্য বিষয়গুলো বাহির থেকে হয়নি বরং বেফাক হাইয়ার দায়িত্বশীলদের কাছাকাছি থাকা কেউ এগুলো করেছে। এমনকি এতে বেফাকের উধ্বর্তন দায়িত্বশীলদের অংশগ্রহন থাকার একটি সম্ভাবনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
তিনি প্রতিবেদক এর কাছে আরও বলেছেন – এমন বিভিন্ন ধরনের তথ্য এবং ডকুমেন্ট আমাদের কাছেও রয়েছে যা আমরা কস্মিনকালেও জনগণের সামনে উম্মুক্ত করবো না কারণ এতে কওমি মাদ্রাসা এবং আলেম-ওলামাদের বদনাম।
তিনি আরও বলেছেন – ফোনালাপ গুলোর প্রকাশ হওয়ায় কিছু বিষয় তো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বেফাকের মধ্যে এক ধরনের গ্রুপিং রয়েছে সেই গ্রুপিংয়ের ফলাফল হিসেবেই মূলত আজকের এই পরিস্থিতি বলে অনেকে ধারণা করছে তবে এর পিছনে আরো কিছু সূক্ষ্ম এবং বিশেষ কারণ আছে যার মধ্যে অন্যতম হলো দুটি পয়েন্ট –
১. বেফাকের বর্তমান অফিসের পাশে ক্রয় করা একটি জমি নিয়ে বিরোধ। যার মধ্যে এক পক্ষ কাঠা প্রতি ৩৫ লাখ টাকার বেশি বাজেট দেওয়ার পর অপর পক্ষ সেখানে কাঠা প্রতি ৩০ লাখ টাকায় কাজ সম্পন্ন করেছে যা নিয়ে এ দু পক্ষের মধ্যে বিরোধ দৃশ্যমান হয়েছিলো।
২. বেফাক ভবনের শেড নির্মান নিয়েও একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিলো দুটি পক্ষের মধ্যে। যার মধ্যে একটি পক্ষ প্রায় অর্ধকোটি টাকার বাজেট চাওয়ার পর অপর পক্ষ সেটিকে অর্ধেক দামে করেছিলেন। যা নিয়েও এই দুটি পক্ষের বিরোধ ছিলো।
এ ধরনের বিভিন্ন ভাগ-বটোয়ারা ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েও মূলত এই দুই গ্রুপ তৈরি হওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে যার বহিঃপ্রকাশই এখন দেখা যাচ্ছে।
একই সাথে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছেন – বেফাক এবং হাইআতুল উলিয়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে এসেছে তার যথাযোগ্য তদন্ত এবং এর সুষ্ঠু সমাধান কওমি মাদ্রাসা এবং এ দেশের আলেম-ওলামাদের স্বার্থে জরুরী। তাই যত দ্রুত সম্ভব এসব নিয়ে তদন্ত করে বেফাক ও হাইআতুল উলিয়া কোন সিদ্ধান্ত আসবে বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। একই সাথে কওমী মাদ্রাসার তরুণ প্রজন্ম যারা রয়েছে তারা বিষয়গুলো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এবং সম্ভব হলে উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে তারপর যে কোন বিষয়ের সত্যতা যাচাই করারও অনুরোধ করেছেন তিনি।



0 মন্তব্যসমূহ
A New Comment
Emoji