ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়া : সাজিদ আহমেদ / Islamer Alo 24




-------   ঃঐতিহাসিক হায়া সোফিয়া ঃ--------      


   ★নাম ও পরিচিতি:- হায়া সোফিয়া এটি তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের ফাতেহ জেলায় অবস্থিত। হায়া সোফিয়ার সূচনা হয়েছিল ৫৩৭খ্রিস্টাব্দে যখন বাইজান্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান ইস্তাম্বুলের গোল্ডেন র্হণ নামে এক জায়গায় একটি বিশাল গীর্জা তৈরির সিন্ধান্ত নেন, তখন জাস্টিনিয়ানের আদেশে অর্থোডক্স গীর্জা হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি মূলত স্থাপন করা হয়েছিল অর্থোডক্স গির্জা হিসেবেই। কিন্তু এই স্থাপনাটি অর্থোডক্স গীর্জা হিসেবে স্থাপনের পর থেকে ১২০৪খ্রি: পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। এরপর এটিকে ক্যাথলিক গীর্জায় রুপান্তর করা হয়, যা ১২০৪খ্রি: থেকে ১২৬১খ্রি: পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তারপর পুনরায় এটিকে অর্থোডক্স গির্জায় রুপান্তর করা হয়, যার মেয়াদ কাল ছিল ১০৬১খ্রি: থেকে ১৪৫৩খ্রি: পর্যন্ত।                        
★গীর্জা থেকে মসজিদে রুপান্তর:- শতাব্দির  মাঝামাঝি (১৪৫৩ সালে) কনস্টান্টিনোপল এর পতনের পর  ফাতেহ সুলতান মুহাম্মদের ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল জয়ের মাধ্যমে তুরস্ক মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।আর তুরস্ক মুসলিম সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে ফাতেহ সুলতান মুহাম্মদ নিজ অর্থায়নে হায়া সোফিয়াকে খ্রিস্টানদের থেকে ক্রয় করে মসজিদে রুপান্তর করেন।  যার নতুন নাম করন করা হয়েছিল 'ইম্পেরিয়াল মসজিদ'।ফলে এটি মুসলমানদের সম্পদে পরিনত হয়। যা প্রায় ৫০০ বছর পর্যন্ত মুসলমানদের স্থায়ী হয়েছিল, এর ভিতর খ্রিস্ট ধর্মের যা যা চিএ ছিল যেমন যীশু, তার মা মেরী, খ্রিস্টান সাধু এবং স্বর্গদূতদের চিএ শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এর উপর প্লাস্টার করা হয়েছিল। বর্তমানে তুরস্কের প্রধান মসজিদ সুলতান আহমেদ মসজিদ, যা "ব্লু মসজিদ" নামে পরিচিত। যা স্থাপিত হয় ১৬১৬ সালে। কিন্তু এই মসজিদ স্থাপনের পূর্বে "ইম্পিরিয়াল মসজিদ"-ই ছিল তুরস্কের প্রধান মসজিদ। এবং এটি ব্লু মসজিদ, রিস্টেম পাশা মসজিদ, ইহজাদে মসজিদ, সলেমনিয়ে মসজিদ, এবং কালী আলী পাশা কমপ্লেক্স সহ আরও অনেক উসমানীয় মসজিদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।১৯৩১ সাল পর্যন্ত এটি মসজিদ হিসেবেই থেকে যায়, তারপর চার বছর বন্ধ ছিলো।
★মসজিদে রুপান্তরের পর অবস্থা :-মসজিদে রূপান্তরের পর এর দেয়ালে মার্বেল পাথরে অঙ্কিত যীশু খ্রিস্টের অনেক গুলো ছবি সিমেন্ট দিয়ে মুছে দেওয়া হয়। ছবিগুলো প্রায় ৫০০ বছরের জন্য সিমেন্টের নিচে চাপা পড়ে। কিন্তু এই স্থাপনাটিকে যাদুঘরে রূপান্তরের পর ছবিগুলো পুনরুদ্ধার করা হয়। ফলে যীশুখ্রিস্টের ছবিগুলো অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে অঙ্কিত "আল্লাহু ও মুহাম্মদ" এর আরবিতে অঙ্কিত মার্বেল পাথরও এর পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়। তাই এই নামগুলোর পাথর অনেক বেশি উজ্জ্বল থাকে। এরপর থেকে এই স্থাপনায় নতুন নিয়ম প্রবর্তন হয়। প্রধান নিয়মটি হল, "এই স্থাপনার মূল অংশ বা হলরুম ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ, সেটি মুসলিম অথবা খ্রিস্টান ধর্ম উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু এই স্থাপনার উভয় ধর্মের জন্য আলাদা সংরক্ষিত জায়গা রয়েছে। অর্থাৎ এই কমপ্লেক্ষটিতে একটি মসজিদ ও একটি গির্জা নির্মাণ করা হয়। যা শুধুমাত্র যাদুঘরের কর্মচারী কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত।"
★মসজিদ থেকে জাদুঘরে রুপান্তর:-          ১৯৩৫ সালে ইসলামী খেলাফত পতনের পর খ্রিস্টানরা হায়া সোফিয়াকে পুনরায় গির্জা বানানোর সিদ্ধান্ত নেই, কিন্তু মুসলমানদের কাছে বিক্রির কারনে পুনরায় এটিকে গির্জা বনানো সম্ভব ছিল না। তাই ধর্মনিরপেক্ষ করতে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক হায়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রুপান্তর করে।জাদুঘর হিসেবে জনসাধারণের জন্য হায়া সোফিয়াকে খোলে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে হায়া সোফিয়া ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনার তালিকায় স্থান পায়। হায়া সোফিয়া ছিল ২০১৪ সালে তুরস্কের দ্বিতীয় সার্বাধিক পরিদর্শন করা জাদুঘর, বার্ষিক প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন দর্শনার্থী এতে আকৃষ্ট হতো। সংস্কৃতি ও পর্যটক মন্ত্রনালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হায়া সোফিয়া ২০১৫ এবং ২০১৯ সালে তুরস্কের সবচেয়ে বেশি পর্যটক আকর্ষণীয় স্থান ছিলো।
★ পুনরায় মসজিদে রুপান্তর :-                               বহুদিন ধরেই ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রুপান্তরের কথা বলে আসছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ৩১ ই মার্চ ২০১৮ সালে সেখানে তিনি পবিএ কোরআন  তেলাওয়াত করে ফাতেহ সুলতান মুহাম্মাদের জন্য দোয়া করেন।  ১০ জুলাই ২০২০ সালের রোজ শুক্রবার তুরস্কের শীর্ষ আদালত এটিকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের রায় ঘোষণা করেন। আদলতের রায়ের পর মসজিদে আজান দেওয়া হয়েছে যা প্রায় ৮৬ বছর পর। অমুসলিম বিশ্বের ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও তুরস্কের ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়া জাদুঘরকে  মসজিদে বানানোর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন রজব তায়্যিব এরদোগান। এ সিদ্ধান্তকে তিনি তুরস্কের "সার্বভৌম আধিকারের ব্যবহার" বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন "যারা নিজ দেশের মুসলিমদের উপর ঘৃণার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না, তারা তুরস্কের সার্বভৌম অধিকার ব্যবহারের ইচ্ছার উপর আক্রমণ করছে"।  ৮৬ বছর পর আবারও হায়া সোফিয়ার আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হলো ইস্তাম্বুল। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম প্রেসিডেন্ট  রজব  তায়্যিব এরদোগানের নেতৃত্বে মুসলমানরা আবারো তাদের হারানো ঐতিহ্য হায়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ফিরে পেল।যা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে এবং মুসলিমদের অন্তরে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 
★গত ২৪ জুলাই ২০২০ রোজ শুক্রবার জুমার নামাযের মাধ্যমে আয়া সোফিয়াতে নামায আদায় শুরু হয়। ইমাম ও খতীব হিসেবে নিযুক্ত হন শাইখ ফুরুহ         মুশতাওয়ার।   


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ